শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪০ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
পুলিশের টহল পিকআপের পাশে যুবলীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৪ রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন সিরাজগঞ্জে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মুড়ি তৈরি করায় জরিমানা ধুনটে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ উঠে এলো একাত্তরের যুদ্ধদিনের কথা জামালপুরের পিংনায় অবৈধ বালুঘাটের ছড়াছড়ি, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার সিরাজগঞ্জে গ্রামীণ নারী দিবসে সমাবেশ ও মেলা অনুষ্ঠিত উল্লাপাড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের দখল করা ঘরগুলো নিয়ন্ত্রনে নিল প্রশাসন চাঁদা না পেয়ে মারধর করায় ইউপি সদস্যের সংবাদ সম্মেলন টাঙ্গাইলে ট্রেন লাইনচ্যুত, ৬ ঘণ্টা পর রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক নারিতায় বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি যাত্রা বিলম্বিত

অপচয়ের চাপে খাদ্য নিরাপত্তা

  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৪.৫৩ পিএম

যমুনার কথা ডেস্ক

বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদিত খাদ্যের একটি বড় অংশ উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়, যা খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। দেশে গড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশ খাদ্য অপচয় বা ক্ষতির শিকার হয় বলে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। অর্থাৎ, তিন কেজি খাদ্য উৎপাদনের বিপরীতে প্রায় এক কেজি খাদ্য হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ খাদ্যের দাম বাড়ছে, আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা এবং বহু মানুষ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে, কৃষকও উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকছেন। এ বাস্তবতায় শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়, উৎপাদিত খাদ্যের ক্ষতি কমানোও জরুরি। কারণ খাদ্য অপচয় রোধের মাধ্যমে খাদ্যের প্রাপ্যতা ও পুষ্টি নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আমদানির ওপর চাপ কমানোর সুযোগ রয়েছে। তাই খাদ্য অপচয় রোধ কেবল কৃষি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

খাদ্য অপচয় কমানো গেলে বিদ্যমান উৎপাদন থেকেই মানুষের জন্য খাদ্যের কার্যকর প্রাপ্যতা বাড়ানো সম্ভব। নষ্ট হওয়া খাদ্যের বড় অংশ সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা গেলে অতিরিক্ত উৎপাদন ও আমদানির প্রয়োজন কিছুটা কমতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ হ্রাস এবং খাদ্য সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে ফল, সবজি, মাছসহ পচনশীল খাদ্যের ক্ষতি কমানো গেলে পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা বাড়বে এবং বাজারে সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে। তবে অপচয় কমলেই মূল্যস্ফীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমবে না; উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবু খাদ্যের অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি রোধ করা সরবরাহ বাড়ানোর একটি কার্যকর উপায়। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যমান খাদ্যসম্পদের সুরক্ষা ও যথাযথ ব্যবহারে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। খাদ্যের ক্ষতি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো উৎপাদনোত্তর ব্যবস্থাপনা। ফসল কাটা, মাড়াই, শুকানো, বাছাই, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের কোনো পর্যায়ে যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয়। ধানের ক্ষেত্রে প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষতির যে তথ্য রয়েছে, তা এ সমস্যার গুরুত্ব তুলে ধরে। ধান কাটার সময় কম্বাইন হারভেস্টারের মতো আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ালে দ্রুত ফসল সংগ্রহ ও মাড়াই করা সম্ভব, ফলে মাঠে ফসল পড়ে থাকা এবং অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট ক্ষতি কমতে পারে। শ্রমসংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপের প্রেক্ষাপটেও এসব যন্ত্রের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। তবে সুফল পেতে কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থায়ন, যন্ত্রের সহজলভ্যতা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ এবং সময়মতো ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ফসল ঘরে তোলা থেকে শুরু করে সংরক্ষণ পর্যন্ত ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল খাদ্য নিরাপত্তায় পুরোপুরি প্রতিফলিত হবে না।

ফল ও সবজির ক্ষেত্রে উৎপাদনোত্তর ক্ষতি খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের ন্যায্য আয়ের পথে বড় বাধা। পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার, মানসম্মত প্যাকেজিং ও দ্রুত পরিবহনের অভাবে উৎপাদিত পণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়। কৃষকের কাছাকাছি সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় অনেক সময় তাদের কম দামেও দ্রুত পণ্য বিক্রি করতে হয়। এতে কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। কৃষক পর্যায়ে কোল্ড স্টোরেজসহ কিছু উদ্যোগ থাকলেও জাতীয় চাহিদার তুলনায় এসব সুবিধা এখনো অপর্যাপ্ত। এ ঘাটতি পূরণে উৎপাদন অঞ্চলভিত্তিক ছোট ও মাঝারি সংরক্ষণাগার, হিমাগার, প্যাকেজিং ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন।

মাছের ক্ষেত্রেও খাদ্য অপচয় খাদ্যনিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। মাছ আহরণ বা চাষের পর বাজার কিংবা ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই প্রায় ২২ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায় বলে তথ্য রয়েছে। পর্যাপ্ত বরফ, উপযুক্ত সংরক্ষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পরিবহন এবং কার্যকর কোল্ড চেইনের অভাব এ ক্ষতির অন্যতম কারণ। উৎপাদন বাড়লেও মানুষের কাছে মাছের সরবরাহ ও প্রাপ্যতা প্রত্যাশিত মাত্রায় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষতি কমাতে আহরণস্থল থেকে বাজার পর্যন্ত শীতল সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বরফের সহজলভ্যতা বাড়ানো, হিমায়িত পরিবহন সুবিধা উন্নত করা এবং আধুনিক বাজার অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।

খাদ্য অপচয় রোধে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহের পাশাপাশি উৎপাদিত ফসলের সংরক্ষণ, গুণগত মান বজায় রাখা এবং বাজারজাতকরণ বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। আধুনিক হারভেস্টার, শুকানোর যন্ত্র, উন্নত সংরক্ষণ প্রযুক্তি, সৌরচালিত কোল্ডস্টোরেজ ও মানসম্মত প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার বাড়াতে সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষক, ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী ও বিক্রেতাদের মধ্যে সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত কোন পর্যায়ে কী ধরনের খাদ্য কতটা নষ্ট হচ্ছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহও অপরিহার্য। এতে ক্ষতির প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ, প্রযুক্তি নির্বাচন ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা সহজ হবে। এ উদ্যোগে সরকার, বেসরকারি খাত, কৃষক সংগঠন ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত অংশগ্রহণ খাদ্য অপচয় কমানোর প্রচেষ্টাকে আরও ফলপ্রসূ করতে পারে।

খাদ্য অপচয় শুধু কৃষকের আর্থিক ক্ষতি নয়, জাতীয় সম্পদ ও পরিবেশেরও অপচয়। এক কেজি খাদ্য উৎপাদনে জমি, পানি, বীজ, সার, জ্বালানি ও কৃষকের শ্রম ব্যয় হয়। উৎপাদিত খাদ্য নষ্ট হলে এসব সম্পদের ব্যবহারও বিফলে যায়। এতে চাহিদা পূরণে অতিরিক্ত উৎপাদনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে, যা সীমিত জমি ও পানির ওপর চাপ বাড়ায় এবং পরিবেশের ক্ষতি তীব্র করে। তাই খাদ্য অপচয় কমানো প্রাকৃতিক সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহার, পরিবেশ সুরক্ষা ও কৃষকের শ্রমের মর্যাদা রক্ষার সঙ্গেও যুক্ত। দুর্বল সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থার কারণে খাদ্য নষ্ট হলে তার দায় শুধু কৃষকের ওপর চাপানো যায় না। এ ক্ষতি কমাতে রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নীতিগত সহায়তা দিতে হবে, ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং ভোক্তাদের পরিকল্পিতভাবে খাদ্য কেনা ও যথাযথ সংরক্ষণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বশীলতা জরুরি।

পোস্টটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের আরও খবর
কপিরাইট © ২০২৬ | যমুনার কথা