-সাকিব আহমেদ
একসময় বাংলাদেশের গ্রামবাংলার পথঘাটে ঘোড়ার গাড়ি ছিল খুবই পরিচিত বাহন। মানুষের যাতায়াত থেকে শুরু করে কৃষিপণ্য, হাট-বাজারের মালামাল কিংবা গৃহস্থালির নানা প্রয়োজনীয় জিনিস এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দিতে ঘোড়ার গাড়ির ওপর নির্ভর করতেন মানুষ। কাঠের চাকা, ঘোড়ার খুরের ছন্দ আর চালকের হাতে লাগাম সব মিলিয়ে ঘোড়ার গাড়ি ছিল গ্রামীণ জীবনযাত্রারই একটি অংশ।
সময়ের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে বড় পরিবর্তন। পাকা রাস্তা, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ভ্যান, ট্রাকসহ আধুনিক যানবাহনের বিস্তারে ঘোড়ার গাড়ির প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে। শহরাঞ্চলে এখনো ঘোড়া বা ঘোড়ার গাড়ি দেখা গেলেও তা মূলত সৌখিনতা, বিনোদন কিংবা বিশেষ আয়োজনকেন্দ্রিক, তাও খুবই কম। মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত বা মালামাল পরিবহনের প্রধান বাহন হিসেবে শহরে ঘোড়ার গাড়ির সেই পুরোনো অবস্থান আর নেই।
কিন্তু সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। যমুনার বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চর, কাঁচা রাস্তা, সরু বাঁধ আর মাঠের ভেতর দিয়ে এখনো ঘোড়ার গাড়ির চলাচল চোখে পড়ে। বিশেষ করে মালামাল পরিবহনে এর জুড়ি নেই। ধান-চাল, খড়, বাঁশ, কাঠ, কৃষিপণ্য, নির্মাণ সামগ্রীসহ নানা ধরনের মালামাল নিয়ে চরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলে এই পুরোনো বাহন। চরাঞ্চলের জীবনই যেন ঘোড়ার গাড়িকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে। চরের অনেক জায়গায় এখনো স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। কোথাও কাঁচা রাস্তা, কোথাও সরু মাটির পথ, আবার কোথাও মাঠের ভেতর দিয়েই চলাচল করতে হয়। এসব পথে বড় যানবাহন চালানো কঠিন। কিন্তু ঘোড়ার গাড়ি সহজেই এগিয়ে যেতে পারে। তুলনামূলক কম খরচে মালামাল পরিবহন করা যায় বলেও চরের মানুষের কাছে এর কদর রয়েছে। তাই চরের মানুষের কাছে ঘোড়ার গাড়ি শুধু অতীতের কোনো স্মৃতি নয়, এখনো বাস্তব প্রয়োজনের একটি বাহন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চালক ও মালিকদের জীবিকাও। একটি ঘোড়া, একটি গাড়ি আর নিজের শ্রম দিয়ে অনেকে পরিবার ও সংসারের খরচ যোগায়।
অন্যদিকে শহরের মানুষ যখন ঘোড়ার গাড়িকে দেখে পুরোনো দিনের স্মৃতি হিসেবে, তখন সিরাজগঞ্জের চরবাসীর কাছে এটি এখনো প্রতিদিনের কাজের সঙ্গী। এই বৈপরীত্যই ঘোড়ার গাড়ির সেকাল-একালকে আলাদা করে তোলে।
এক সময় যে বাহন ছিল মানুষের সাধারণ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম ভরসা, আধুনিকতার যুগে এসে সেটি শহরে প্রায় হারিয়ে গেছে, কোথাও কোথাও শুধু সৌখিনতার অংশ হয়ে টিকে আছে। অথচ যমুনার চরাঞ্চলে মানুষের প্রয়োজনের কারণে সেই পুরোনো বাহন এখনো নিজের জায়গা ধরে রেখেছে। ঘোড়ার খুরের টগবগ শব্দ তাই এখানে কেবল নস্টালজিয়ার শব্দ নয় এটি জীবিকা, প্রয়োজন এবং টিকে থাকার গল্প। শহরের কাছে ঘোড়ার গাড়ি এখন স্মৃতি ও সৌখিনতা, আর সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলে এখনো তা জীবনের প্রয়োজন।