শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৩ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
পুলিশের টহল পিকআপের পাশে যুবলীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৪ রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন সিরাজগঞ্জে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মুড়ি তৈরি করায় জরিমানা ধুনটে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ উঠে এলো একাত্তরের যুদ্ধদিনের কথা জামালপুরের পিংনায় অবৈধ বালুঘাটের ছড়াছড়ি, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার সিরাজগঞ্জে গ্রামীণ নারী দিবসে সমাবেশ ও মেলা অনুষ্ঠিত উল্লাপাড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের দখল করা ঘরগুলো নিয়ন্ত্রনে নিল প্রশাসন চাঁদা না পেয়ে মারধর করায় ইউপি সদস্যের সংবাদ সম্মেলন টাঙ্গাইলে ট্রেন লাইনচ্যুত, ৬ ঘণ্টা পর রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক নারিতায় বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি যাত্রা বিলম্বিত

বজ্রপাতরোধে ২৪ বছর ধরে তালবীজ রোপণ করছেন দর্জি আবুল কালাম

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৩.২৩ পিএম

যমুনার কথা ডেস্ক 

২০০২ সালের এক বর্ষার দুপুর। মামার বাড়িতে বসে থাকা আবুল কালাম আজাদ হঠাৎ দেখলেন, বিকট শব্দে বজ্রপাত আঘাত হানল উঠানের একটি তালগাছে। চোখের সামনে গাছটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেও অক্ষত রইলেন বাড়ির মানুষজন। সেই ঘটনা মনে গেঁথে যায় তাঁর। এরপর থেকেই শুরু তালগাছ লাগানোর নেশা। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ২৪ বছর, আর তার হাতে রোপণ হয়েছে সাড়ে ১১ হাজার তালবীজ। এসব গাছ নিয়মিত পরিচর্যাও করেন তিনি।

পেশায় দর্জি আবুল কালাম আজাদ এখন স্থানীয়দের কাছে ‘তালগাছ প্রেমী’ হিসেবে পরিচিত। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর, বর্ষা কিংবা তীব্র শীত প্রায় প্রতিদিনই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে সাইকেলে বেরিয়ে পড়েন তিনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক কিংবা বাঁধের পাশে নিজের লাগানো গাছগুলোর পরিচর্যাও করেন।

নিজ উদ্যোগে সিরাজগঞ্জ শহরের কাটাখালি, ইলিয়ট ব্রিজ, সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহররক্ষা ক্রসবার-৩ ও ৪ নম্বর বাঁধ, সিরাজগঞ্জ শহরের কাজিপুর আঞ্চলিক সড়ক, সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর, বহুলী ও শিয়ালকোল ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে অন্তত সাড়ে ১১ হাজার তালবীজ বুনেছেন আবুল কালাম। একইসঙ্গে এসব এলাকার সড়ক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত দুই হাজার খেজুর গাছের বীজও বপন করেছেন তিনি।

প্রতিদিন সাইকেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে থাকে কোঁদাল, পানির বোতল ও দা। লাগানো চারার পাশের আগাছা হলে তুলে ফেলেন। বৃষ্টিতে গাছের গোড়া থেকে মাটি সরে গেলে অন্য জায়গা থেকে মাটি এনে তা ভরাট করেন। পাশাপাশি স্থানীয়দের তালগাছ রক্ষায়ও উদ্বুদ্ধ করেন তিনি।

 

যেভাবে তালগাছের প্রতি ভালোবাসা:

তালগাছ লাগানোর শুরুটা হয়েছিল ২০০২ সালের সেই বজ্রপাতের ঘটনা থেকে। সেদিন কালিয়াহরিপুর ইউনিয়নের কল্যাণী গ্রামের মামার বাড়িতে দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন আবুল কালাম। দুপুরে সেখানে ছিলেন ১৫ থেকে ২০ জন আত্মীয়-স্বজন। হঠাৎ বৃষ্টির সঙ্গে শুরু হয় বিকট শব্দে একের পর এক বজ্রপাত।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, হঠাৎ একটি বজ্রপাত তার চোখের সামনে পড়ে। প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো বাড়ি। বজ্রপাতটি বাড়ির উঠানে থাকা উঁচু একটি তালগাছের মাথায় পড়ে। চোখের পলকে চিরে ছিন্নভিন্ন করে দেয় গাছটি। তিনি বলেন, তালগাছটি যেন বুক পেতে সবাইকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। গাছটি পুড়ে গেলেও বাড়িতে থাকা কারও কোনো ক্ষতি হয়নি। পরে লোকজন বলাবলি করছিলেন, তালগাছ অনেক উঁচু হওয়ায় বজ্রপাতকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে এবং মাটিতে নামিয়ে আনে। ফলে আশপাশে থাকা মানুষ ও গবাদিপশুর ক্ষতি হয় না। এসব শুনেই তার মনে হয়েছিল, প্রায়ই তো বজ্রপাতে মানুষ মারা যায়। মাঠে-ঘাটে আরও তালগাছ থাকলে নিশ্চয়ই এমনটা হতো না। পরে এই কৌতূহল থেকেই তালগাছের প্রতি তার আগ্রহ বাড়ে। ঘটনার কিছুদিন পর একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের লেখা তালগাছ ও পরিবেশ বিষয়ক একটি কলাম পড়েন আবুল কালাম। সেখানেও ওই শিক্ষক তালগাছের নানা গুণের কথা লিখেছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, মাথা উঁচু এই গাছটি বজ্রপাতকে দুর্বল করে দেয় এই কথাটি তার মনে ধরে যায়। এরপর দুই-তিন দিনের মধ্যে আশপাশের বাড়ি থেকে প্রায় শতাধিক তালবীজ সংগ্রহ করেন আবুল কালাম। ওই বছরের আগস্ট মাসের দিকে সেগুলো সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের অভ্যন্তরে রোপণ করেন তিনি। এভাবে প্রথম বছরেই প্রায় এক হাজার বীজ লাগানো হয়েছিল।

 

নিজের আয়ের টাকা, নিজের শ্রম:

নানা উপায়ে তালবীজ সংগ্রহ করেন আবুল কালাম। কোথাও তাল বীজের খোঁজ পেলেই ছুটে যান সেখানে। সদর উপজেলার ১৫ থেকে ২০টি গ্রাম থেকে তালবীজ সংগ্রহ করেন তিনি। কেউ বিক্রি করেন, আবার কেউ বিনা পয়সায় দিলে খুশি মনে তা নেন। এছাড়া শহরের আবর্জনার স্তূপ ও তাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও তাল বীজ সংগ্রহ করেন। তিনি বলেন, একেকটি বীজ কিনতে সব মিলিয়ে প্রায় ৪ টাকা খরচ হয়। নিজের আয়ের একটি অংশ এর পেছনে খরচ করেন তিনি। প্রথম দিকে আবুল কালামের পরিবারের লোকজন তার ওপর বিরক্ত হতেন। এখন তারাও সহযোগিতা করছেন। নিজ মহল্লার প্রতিবেশীরাও শুরুতে তার এই কাজ ভালোভাবে নেননি। তবে এখন তাদের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে।

বড় হয়েছে সেই তালগাছ:

২০০২ সালের আগস্ট মাসে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে লাগানো অর্ধশত তালগাছ এখন অনেক বড় হয়েছে। সেগুলোতে ফল ধরেছে। নানা প্রজাতির পাখি, বিশেষ করে বাবুই এসে বাসা বেঁধেছে। শিক্ষার্থীরা অনেকে কাঁচা তাল পেড়ে খায়। তাল পাকলে কেউ কেউ আবার সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে যায়। এসব দেখে আবুল কালামের মন ভালো হয়ে যায়। তবে নানা কারণে তার লাগানো বেশ কিছু গাছ নষ্টও হয়েছে। ২০২১ সালের দিকে সিরাজগঞ্জ-কাজিপুর আঞ্চলিক সড়ক প্রশস্ত করার কারণে অনেক গাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে স্থানীয়রাও কিছু গাছ নষ্ট করেছেন। আবার প্রতিনিয়ত হাতপাখা ব্যবসায়ীরা ছোট ছোট গাছের পাতা কেটে নিয়ে যান। এভাবে অনেক চারা নষ্ট হয়েছে। তারপরও হতাশ নন আবুল কালাম।

 

তিন কিলোমিটারজুড়ে তার লাগানো গাছ:

সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা ক্রসবার ৩নম্বর বাঁধ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাঁধজুড়ে ৮-১০ বছরের পুরোনো তালগাছগুলো বড় হয়ে গেছে। বাঁধের প্রধান ফটক থেকে বিসিক শিল্পপার্ক এলাকার বেলুটিয়া পর্যন্ত তিন কিলোমিটার অংশে আবুল কালামের লাগানো দুই হাজারের বেশি তালগাছের দেখা মেলে।

বাঁধের পাশের বাসিন্দা আশরাফ সেখ বলেন, আবুল কালামের মতো নিঃস্বার্থ মানুষ হয় না। পরিবারের আপত্তি কিংবা স্থানীয়দের উৎপাত কোনো কিছুই তাকে তালগাছ লাগানোর পাগলামি দমন করতে পারেনি। নিজের জায়গা নেই, তবুও রাস্তার পাশের সরকারি জায়গায় তালগাছ রোপণ করেন তিনি। এ কারণে এলাকার মানুষ তাকে তালগাছ প্রেমী হিসেবেই চেনেন। তার এই অবদানকে একটি ভালো উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন তারা।

দর্জি পেশার সহকর্মী মির্জা জাকির হোসেন বলেন, আবুল কালাম তালগাছগুলো রোপণ করে নিয়মিত একটি খাতায় লিপিবদ্ধ করেন। তার দীর্ঘ ২৪ বছরের হিসাবেই প্রায় সাড়ে ১১ হাজার তালগাছ রোপণ করেছেন। এসব তালগাছ এক সময় তার স্মৃতি হয়ে সবার মাঝে বেঁচে থাকবে। যা শুধু বজ্রপাত নিরোধ হিসেবেই কাজ করে না। কাঁচা তালের শাঁস গরমের দিনে অত্যন্ত আরামদায়ক ও তৃপ্তিদায়ক। পাকা তালের রস দিয়ে পিঠা, কেক ও নানা সুস্বাদু খাবারও তৈরি হয়।

আবুল কালাম আজাদে পারিবারিক জীবন:

তালগাছ প্রেমী আবুল কালাম আজাদ ১৯৬২ সালের ৫ মার্চ সিরাজগঞ্জ শহরের সয়াধানগড়া মধ্যপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৃত রহতুল্লাহ তালুকদার পেশায় একজন দর্জি ছিলেন। আবুল কালাম ১৯৭৬ সালে শহরের জ্ঞানদায়িনী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পাস করেন। এরপর আর মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনো হয়নি। বৃদ্ধ মা-বাবা, এক ভাই ও তিন বোনের সংসারের হাল ধরতে বাবার পেশায় জড়িয়ে পড়েন তিনি।

বর্তমানে ৬৪ বছর বয়সেও দর্জি পেশায় রয়েছেন আবুল কালাম। স্ত্রী ও চার মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বাকি একজন নার্সিং ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে চাকরির চেষ্টা করছেন এবং আরেকজন ডিপ্লোমা শেষ করে ইন্টার্নশিপ করছেন।

 

পাশে থাকার আশ্বাস:

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুন খান বলেন, তালগাছের প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত উপকারিতা অপরিসীম। আবুল কালাম এ উপজেলায় দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে তিনি তালগাছ লাগিয়ে আসছেন, এটি নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ। তিনি কোনো সহযোগিতা চাইলে আমরা অবশ্যই তার পাশে দাঁড়াব।

 

পোস্টটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের আরও খবর
কপিরাইট © ২০২৬ | যমুনার কথা