শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৮ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
পুলিশের টহল পিকআপের পাশে যুবলীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৪ রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন সিরাজগঞ্জে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মুড়ি তৈরি করায় জরিমানা ধুনটে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ উঠে এলো একাত্তরের যুদ্ধদিনের কথা জামালপুরের পিংনায় অবৈধ বালুঘাটের ছড়াছড়ি, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার সিরাজগঞ্জে গ্রামীণ নারী দিবসে সমাবেশ ও মেলা অনুষ্ঠিত উল্লাপাড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের দখল করা ঘরগুলো নিয়ন্ত্রনে নিল প্রশাসন চাঁদা না পেয়ে মারধর করায় ইউপি সদস্যের সংবাদ সম্মেলন টাঙ্গাইলে ট্রেন লাইনচ্যুত, ৬ ঘণ্টা পর রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক নারিতায় বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি যাত্রা বিলম্বিত

রায়গঞ্জে প্রজন্মের স্মৃতি বুকে নিয়ে টিকে আছে বাংলার ঐতিহ্য মাটির ঘর

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৪.৪৯ পিএম

ফাতেমা, রায়গঞ্জ সংবাদদাতা:

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জেএকসময় গ্রামবাংলার
প্রতিটি জনপদের চেনা দৃশ্য ছিল মাটির ঘর। পুরু মাটির দেয়াল,খড় কিংবা টিনের ছাউনি, মাটির উঠান সব মিলিয়ে এসব ঘর ছিল বাংলার গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই ঘরের আঙিনায় বেড়ে উঠেছে অসংখ্য প্রজন্ম। ঈদের আগে ঘর লেপাপোছা, দেয়ালে নতুন মাটির প্রলেপ দেওয়া কিংবা উঠান পরিষ্কার করার মধ্যেও ছিল এক অন্যরকম আনন্দ।সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামে বেড়েছে ইট-সিমেন্টের দালান ও পাকা ভবন। টিনের ঘরের জায়গাও নিয়েছে আধুনিক নির্মাণশৈলী।ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে একসময়ের ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর।তবে রায়গঞ্জেরনিমগাছি,ধামাইনগড়,বাকাই,চন্ডীভোগ,মালতিনগর গ্রামাঞ্চলে এখনো কিছু মাটির ঘর টিকে আছে।এসব ঘর শুধু বসবাসের স্থান নয়, অনেক পরিবারের কাছে এগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একেকটি জীবন্ত ইতিহাস।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, পুরোনো মাটির ঘরগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে সময়ের সাক্ষী হয়ে। কোনো ঘরে এখনো বসবাস করছেন বয়স্ক মানুষ, আবার কোনোটি পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। কিছু ঘর ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের সুযোগ থাকলেও শুধুমাত্র পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধরে রাখতে অনেক পরিবার সেগুলো এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছেন।

সোনাখারা ইউনিয়নের দোস্তপাড়া গ্রামের ৪০ বছর বয়সী সালেহা খাতুন এখনো স্বামীর রেখে যাওয়া মাটির ঘরেই বসবাস করছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ঘরই তার ঠিকানা। প্রায় ২৫বছর আগে স্বামী মারা গেলেও ঘরটি ছেড়ে যাননি তিনি। জীবনের দীর্ঘ পথচলার সুখ-দুঃখ,স্বজন হারানোর বেদনা আর অসংখ্য স্মৃতি যেন মিশে আছে ঘরটির প্রতিটি দেয়ালে।

ধুবিল ইউনিয়নের মালতিনগর গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী আলতাফ হোসেনের জীবনও জড়িয়ে আছে একটি পুরোনো মাটির ঘরের সঙ্গে। মৃত রমিজ উদ্দিনের স্ত্রী আনোয়ারা সারাজীবন কাটিয়েছেন এই ঘরেই। স্বামীর মৃত্যুর এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জীবনের শেষ সময়টুকুও কাটছে সেই পুরোনো ঘরে।আলতাফ হোসেনের বড় ছেলে রুহুল আমীন বলেন,মাটির ঘরটি শুধু আমাদের বসতবাড়ি নয়,এটি বাবার জীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। এই ঘরের সঙ্গে আমাদের শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

ধামাইনগরইউনিয়নের,বাকাই,কুরচা,শালিয়াগড়ী,জামতৈল সহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো চোখে পড়ে পুরোনো মাটির ঘর। কোনোটি বসতঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোনোটি আবার দীর্ঘদিনের অযত্নে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। তবুও সেগুলো যেন হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার গল্প বলে যাচ্ছে।

স্থানীয় প্রবীণরা জানান,একসময় বাপ-দাদার তৈরি মাটির ঘরেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম বসবাস করত। পুরু মাটির দেয়ালের কারণে গরমের সময় ঘরের ভেতর তুলনামূলক ঠান্ডা থাকত। অনেক পরিবারে দুইতলা মাটির ঘরও ছিল। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরের তলায় যাতায়াত করতেন পরিবারের সদস্যরা। স্থানীয়ভাবে এসব ঘর ‘কোঠা ঘর’ নামেও পরিচিত ছিল।

মাটির ঘর তৈরির প্রক্রিয়াটিও ছিল বেশ ঐতিহ্যবাহী। মাটির সঙ্গে তুষ ও চুনা মিশিয়ে কাঠের খুঁটির ওপর স্তরে স্তরে মাটি লেপে তৈরি করা হতো পুরু দেয়াল। দক্ষ কারিগররা নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তৈরি করতেন এসব ঘর। নির্মাণশৈলীর সেই ঐতিহ্যও এখন প্রায় হারিয়ে গেছে।
বাকাই গ্রামের সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম  বলেন,বাপ-দাদার আমল থেকেই আমাদের বাড়িতে মাটির ঘর ছিল। এখনও আমরা মাটির ঘরে থাকি। এখনো আমরা মাটির ঘরেই থাকেন। শুধু বাপ-দাদার স্মৃতি ধরে রাখতেই ঘরটি ভাঙিনি।

মালতিনগর গ্রামের কৃষক মো.শহিদুল ইসলাম বলেন, জন্মের পর থেকেই বাবা-মাকে মাটির ঘরে থাকতে দেখেছি। পরিবারের সুখ-দুঃখের অনেক স্মৃতি এই ঘরকে ঘিরে। ঈদের আগে মা-বাবা ঘরটি নতুন করে লেপে দিতেন। তখন ঘরটিও যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেত।

গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে মাটির ঘরের সম্পর্ক ছিল গভীর। একসময় টিনের ঘর ও দালানকোঠার প্রচলন না থাকায় মানুষ মাটির ঘরেই বসবাস করত। বর্তমানে এসব ঘর কমে গেলেও কোথাও কোথাও এখনো মানুষ বসবাস করছেন। এসব ঘরের সঙ্গে তাদের জীবনের নানা স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।

একসময় যে মাটির ঘর ছিল সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের আবাস, সময়ের পরিবর্তনে সেটিই আজ হয়ে উঠেছে হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের প্রতীক। মাটি, তুষ ও চুনে তৈরি এসব ঘরের দেয়ালে শুধু মাটির গন্ধ নেই মিশে আছে শৈশব, ভালোবাসা, সংসার, উৎসব, আনন্দ-বেদনা আর প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতি।

তাই রায়গঞ্জের গ্রামাঞ্চলে টিকে থাকা অল্পসংখ্যক মাটির ঘর এখন কেবল পুরোনো বসতবাড়ি নয়; এগুলো বাংলার হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী। সময়ের স্রোতে একদিন হয়তো এসব ঘরও হারিয়ে যাবে, কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে মাটির ঘর বেঁচে থাকবে বাংলার শেকড়ের গল্প হয়ে।

পোস্টটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের আরও খবর
কপিরাইট © ২০২৬ | যমুনার কথা