বিশেষ প্রতিনিধি:
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি এমন অভিযোগ ওঠায় তিনি নিজ কর্মস্থল ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। রবিবার সকালে সিরাজগঞ্জ শহরের হোসেনপুর দক্ষিণ এলাকায় অবস্থিত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি।
কার্যালয় সূত্র বলছে, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদ গত বুধবার (১৫ অক্টোবর) সর্বশেষ অফিসে এসেছিলেন। এরপর দাপ্তরিক প্রয়োজনে তার মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে বারংবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, হারুন অর রশিদ গাইবান্ধার বাসিন্দা ও ৩৬তম বিসিএস কর্মকর্তা। তিনি চব্বিশের অভ্যুত্থান পরবর্তী ২৭ আগস্ট সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে যোগদান করেন। এরআগে বিভিন্ন জেলায় খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তার এই দায়িত্বের আড়ালে লুকিয়ে ছিল ১১টি সরকারি দপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সক্রিয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়েছিলেন ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৭৬ জন চাকরিপ্রার্থী।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ওইদিন ঢাকা মহানগরের ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর ছড়িয়ে পড়ে। এরপর পরীক্ষা শুরুর ২-৩ মিনিটের মাথায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় পরদিন ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) আতিকুর রহমান বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এ মামলার নথিপত্র রবিবার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়েছে।
ওই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এর মধ্যে গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নতুন করে এই নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের খোঁজে মাঠে নামে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে বেরিয়ে এসেছে বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্কের তথ্য। উঠে এসেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম, এরই মধ্যে ওই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
সূত্রটি বলছে, এই প্রশ্ন ফাঁস নেটওয়ার্কের বিস্তার শুধু একটি দপ্তর বা কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই সিন্ডিকেট। এতে কেউ কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী, কেউ আছেন প্রশ্ন ও পরীক্ষার্থী সংগ্রহের দায়িত্বে, আবার কেউ এক স্তর থেকে আরেক স্তরে প্রশ্ন পৌঁছে দেন। কেউ কাজ করেন পরীক্ষার্থী সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ের যোগাযোগে। সব মিলিয়ে প্রশ্নফাঁসের একটি বহু স্তরীয় নেটওয়ার্ক।
প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে সাতজনকে গ্রেপ্তারের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া সাতজনের মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ টেক্সটিং পর্যালোচনা করে অন্তত ১১টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এসব পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা, হিসাব সহকারী, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, উপ-খাদ্য পরিদর্শক, খাদ্য মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা, অডিটর, কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স (সিজিডিএফ), পরিবেশ অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা, রাজশাহী পোস্টাল অপারেটর এবং মেইল অপারেটর নিয়োগ পরীক্ষা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সুজিত গোপ। পুরো কার্যক্রমে মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন তিনি। গা ঢাকা দেওয়ায় সুজিত গোপকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সুজিত গোপকে গ্রেপ্তার করা গেলে তার ওপরে আর কেউ আছে কি না, সেই তথ্য পাওয়া যাবে। সুজিত গোপের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে কাজ করেন কয়েকজন সহযোগী। তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহকারী আসাদুল হাবিব, একটি ট্যাক্স ফার্মের কর্মচারী নূর মোহাম্মদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিম্নমান সহকারী বা পেশকার জাহাঙ্গীর আলম ও চক্রের সদস্য এস এম এমদাদুল রহমান। তাদের দায়িত্ব নেটওয়ার্কের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশ্ন ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া। এমদাদুলের দায়িত্ব মতিঝিল এলাকার। এই এলাকায় যেসব পরীক্ষার্থীর পরীক্ষার সিট পড়ত, তাদেরকে গোপন বুথে প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করাতেন এমদাদুল। তার গোপন বুথ ছিল মতিঝিল এলাকায়। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরীক্ষায় মতিঝিলের একটি কক্ষে এমদাদুল এবার ১৫ জনকে প্রশ্ন পড়িয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর তার থেকে প্রশ্ন যেত মফিজুল ইসলাম ওরফে রাফি ও হাসিনুর রহমান সুজন নামের দুজনের কাছে। মফিজুলের কাছ থেকে প্রশ্ন যেত পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মোহাম্মদ রুবেল ইসলামের কাছে। এদের সাতজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
চক্রের রুবেল ইসলাম ২০২০ সালের আগে কম্পিউটারের দোকানদার ছিলেন। প্রযুক্তির সেই ব্যবসায় অনলাইনে ফরম পূরণ, ডাউনলোডিং, প্রিন্টিং, টাইপিং করতে গিয়ে প্রশ্নফাঁস চক্রে জড়িয়ে পড়েন। প্রশ্নফাঁস চক্রের এরপরের লেয়ারের কাউকেই এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওপরের কর্মকর্তাদের গ্রেফতারের খবরে সিরাজগঞ্জের খাদ্য কর্মকর্তাসহ অন্যরা গা ঢাকা দিয়েছেন।
চক্রটির শেষ লেয়ারে কাজ করতেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক (সংস্থাপন) সোহাগ ফকির। তার কাছ থেকে প্রশ্ন যেত সিরাজগঞ্জের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদের হাতে। এই লেয়ারে হারুন ছাড়াও কাজ করতেন আরও অন্তত ৩ জন। তবে হারুন-সোহাগ সিন্ডিকেট ছিল সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। হারুন ও সোহাগ দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। পড়াশোনার সময় থেকেই তাদের মধ্যে বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠে। বাকি ৩ কর্মকর্তা হলেন- বিসিএসআইআরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর কাজল আহমেদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সহকারী পরিচালক রাফিউল ইসলাম ও ভরতখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক হরি প্রসাদ রায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর সেটির উত্তর তৈরি করে চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে তাদের মাধ্যমে সম্ভাব্য পরীক্ষার্থী ও প্রশ্নপত্রের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যায় উত্তরপত্র।