শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৯ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
পুলিশের টহল পিকআপের পাশে যুবলীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৪ রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন সিরাজগঞ্জে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মুড়ি তৈরি করায় জরিমানা ধুনটে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ উঠে এলো একাত্তরের যুদ্ধদিনের কথা জামালপুরের পিংনায় অবৈধ বালুঘাটের ছড়াছড়ি, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার সিরাজগঞ্জে গ্রামীণ নারী দিবসে সমাবেশ ও মেলা অনুষ্ঠিত উল্লাপাড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের দখল করা ঘরগুলো নিয়ন্ত্রনে নিল প্রশাসন চাঁদা না পেয়ে মারধর করায় ইউপি সদস্যের সংবাদ সম্মেলন টাঙ্গাইলে ট্রেন লাইনচ্যুত, ৬ ঘণ্টা পর রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক নারিতায় বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি যাত্রা বিলম্বিত

সম্পাদকীয়- মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৩.৩২ পিএম

হাজী আব্দুস সাত্তার – 

জীবনে অনেক মানুষ আসে, আবার সময়ের সঙ্গে হারিয়েও যায়। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাদের কথা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি মনে পড়ে। তাদের একজন হলেন শিক্ষক। জীবনের প্রথম অক্ষর শেখানো থেকে শুরু করে ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝানো, স্বপ্ন দেখতে শেখানো এবং ব্যর্থ হলে আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস দেওয়া ব্যক্তিটি  হলেন আমাদের শিক্ষক। যিনি নীরবে আমাদের জীবনের ভিত গড়ে দেন।

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এই দিনটি শুধু শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়। বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের অবদানের কথা নতুন করে মনে করার দিন। যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোরও একটি বিশেষ সুযোগ এই দিন। একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের পাঠ দেন না। একটি শিশুর হাতে যখন প্রথম বই তুলে দেওয়া হয়, তখন তার সামনে যে পৃথিবীর দরজা খুলে যায়, সেই দরজা খুলে দেওয়ার কাজে শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন ভালো শিক্ষক শিক্ষার্থীর ভুল ধরিয়ে দেন, আবার সেই ভুল থেকে শেখার সুযোগও তৈরি করেন। তিনি শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার কথা বলেন না। একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দেন। আমাদের জীবনে এমন অনেক শিক্ষক আছেন, যাঁদের হয়তো আমরা বছরের পর বছর দেখিনি। কিন্তু তাঁদের বলা কোনো একটি কথা আজও মনে পড়ে। কোনো কঠিন সময়ে তাঁদের দেওয়া পরামর্শ সাহস জোগায়। পরীক্ষায় ভালো ফল করার পর তাঁদের মুখের হাসি, আবার ব্যর্থ হলে তাঁদের সান্ত্বনার কথা এসব স্মৃতি জীবনের সঙ্গে থেকে যায়। এটাই একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় অর্জন।

একজন চিকিৎসক মানুষের জীবন বাঁচান, একজন প্রকৌশলী স্থাপনা নির্মাণ করেন, একজন কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন। কিন্তু এসব পেশার মানুষ তৈরির পেছনেও কোনো না কোনো শিক্ষকের অবদান থাকে। সমাজের প্রায় প্রতিটি পেশার মানুষের জীবনের শুরুতেই একজন শিক্ষকের হাত থাকে। তাই একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের দেশেও অসংখ্য শিক্ষক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। শহরের আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত বিদ্যালয় কিংবা দুর্গম চরাঞ্চলের স্কুল—সব জায়গাতেই শিক্ষকরা শিশুদের শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেক শিক্ষক প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যান। কখনো প্রতিকূল পরিবেশ, কখনো নানা সীমাবদ্ধতা, আবার কখনো প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবের মধ্যেও তাঁরা পাঠদান চালিয়ে যান। বিশেষ করে গ্রামের দরিদ্র পরিবারের একটি শিশুকে স্কুলমুখী রাখা সহজ কাজ নয়। অনেক সময় শিক্ষকই শিক্ষার্থীর পরিবারকে বোঝান, পড়াশোনা বন্ধ না করার জন্য উৎসাহ দেন। কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন স্কুলে না এলে তার খোঁজ নেন। কারও পড়াশোনার সমস্যা হলে নিজের সময় দিয়ে বুঝিয়ে দেন। এসব কাজের অনেকটাই হয় নীরবে, কোনো প্রচার ছাড়াই। তবে বাস্তবতা হলো, শিক্ষকদের কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু প্রত্যাশা করি, কিন্তু তাঁদের প্রয়োজন ও সমস্যার কথা সবসময় যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভাবি না। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে আমরা ভালো ফলাফল চাই, শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন চাই, আধুনিক শিক্ষা চাই। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁদের কাজের পরিবেশ, প্রশিক্ষণ, সম্মান, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে শুধু নতুন ভবন বা নতুন বই দিলেই হবে না। একজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকা শিক্ষকই শিক্ষার প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারেন। তাই শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ এবং তাঁদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। অভিভাবকদেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সন্তান পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না করলে অনেক সময় শিক্ষককে দায়ী করা হয়। অথচ একটি শিশুর শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষক ও সমাজ এই তিন পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি হয়। তাই শিক্ষককে প্রতিপক্ষ নয়, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার সহযোগী হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষার্থীদেরও মনে রাখতে হবে, শিক্ষকের প্রতি সম্মান শুধু একটি দিবসে ফুল দেওয়া বা শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষকের পরিশ্রমকে সম্মান করা, তাঁর দেওয়া শিক্ষা জীবনে কাজে লাগানো এবং একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠাই হতে পারে শিক্ষকের প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা। আজ প্রযুক্তির যুগ। তথ্য পাওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। একটি মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার থেকেই নানা বিষয়ে জানা যায়। কিন্তু তথ্য আর শিক্ষা এক জিনিস নয়। কোন তথ্য সঠিক, কোনটি ভুল। কিভাবে চিন্তা করতে হবে, কিভাবে মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে—এসব শেখাতে একজন শিক্ষকের প্রয়োজন আজও আগের মতোই আছে। বরং তথ্যের এই ভিড়ে সঠিক পথ দেখানোর জন্য একজন ভালো শিক্ষকের প্রয়োজন আরও বেশি। একজন শিক্ষক হয়তো জানেন না, তাঁর পড়ানো কোনো শিক্ষার্থী একদিন কি হবে। তাঁর ছাত্র হয়তো চিকিৎসক হবে, কেউ প্রকৌশলী, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ কৃষিবিদ, কেউ সাংবাদিক, কেউ দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবে। কিন্তু সেই মানুষগুলোর শৈশবের ভিত গড়ে দেওয়ার অংশীদার থাকবেন সেই শিক্ষকই। তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমাদের শুধু শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানালেই হবে না। তাঁদের যথাযথ সম্মান, মর্যাদা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়েও ভাবতে হবে। কারণ শিক্ষককে সম্মান করা মানে শুধু একজন পেশাজীবীকে সম্মান করা নয়। বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সম্মান করা। একটি জাতি কতটা এগিয়ে যাবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে সে জাতি তার শিক্ষকদের কতটা মূল্যায়ন করে তার ওপর। তাই আসুন, শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা শুধু কথায় নয়, আমাদের আচরণ ও রাষ্ট্রীয় নীতিতেও প্রকাশ করি। যাঁরা আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে হাঁটতে শিখিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা যেন শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। শিক্ষক শুধু পাঠ দেন না, তাঁরা মানুষ গড়েন। আর মানুষ গড়ার এই কাজের চেয়ে বড় দায়িত্ব খুব কমই আছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের আরও খবর
কপিরাইট © ২০২৬ | যমুনার কথা