উল্লাপাড়া সংবাদদাতা:
চলনবিলখ্যাত সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও সলঙ্গা অঞ্চলে দেশি মাছের সংকটে শুঁটকি উৎপাদনে দেখা দিয়েছে ভাটা। একসময় দেশি মাছে ভরপুর থাকা শুঁটকি চাতালগুলোতে এখন নেই আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য। সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে বেশি দামে মাছ কিনে শুঁটকি তৈরি করেও বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আর কাজ কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন চাতালের শ্রমিকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া, মোহনপুর ও বড় পাঙ্গাসী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় শুঁটকি উৎপাদন হয়ে থাকে। স্থানীয় বিল, নদী, খাল ও জলাশয় থেকে সংগ্রহ করা শোল, টাকি, পুঁটি, টেংরা, কাচকি, চিংড়ি, মলা, ঢেলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ দিয়ে তৈরি হয় এসব শুঁটকি। মাছ পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাত করার পর বাঁশের চাতালে রোদে শুকিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে সরবরাহ করা হয়। তবে এবার মাছের সরবরাহ কম থাকায় অনেক চাতালে উৎপাদন সীমিত হয়ে গেছে। কোথাও অল্প পরিমাণ মাছ শুকানো হচ্ছে, আবার কোথাও মাছের অপেক্ষায় অলস সময় পার করছেন শ্রমিকরা। এতে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
শুঁটকি ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম দৈনিক যমুনার কথাকে জানান, প্রতিবছর এ সময়ে দেশি মাছের সরবরাহ বেশি থাকলেও এবার তুলনামূলক কম মাছ পাওয়া যাচ্ছে। বেশি দামে মাছ কিনে শুঁটকি তৈরি করেও লাভ হচ্ছে না। ঢাকা ও সৈয়দপুর রংপুর সহ বিভিন্ন বাজারে শুঁটকি পাঠিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হতো বলেও জানান তিনি।
শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, মাছের সংকটে বিপাকে পড়েছেন চাতালের নারী শ্রমিকেরাও। দীর্ঘ ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে শুঁটকি চাতালে দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন এমন অনেক নারী। তাঁদের কাজের বড় অংশই মাছ পরিষ্কার, কাটাকাটি ও শুকানোর সঙ্গে জড়িত। আগে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজের চাপ থাকলেও এখন মাছ কম আসায় কাজের সুযোগ কমেছে। ফলে আয় কমে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
নদী নামের এক নারী শ্রমিক জানান, ভোর ৬ টার দিকে কাজে এসে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু দিনমজুরির টাকায় সংসার চালানো আমাদের কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে মাছ বেশি আসত, কাজও বেশি ছিল। এখন মাছ কম আসায় অনেক সময় বসে থাকতে হয়। এতে তাঁদের আয়ও কমে গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশি মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে জলাশয়ে পানির স্থায়িত্ব কমে যাওয়া, বৃষ্টি ও বন্যার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন এবং অবৈধ জালের ব্যবহার ভূমিকা রয়েছে। মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, পোনা নিধন বন্ধ এবং বিল-খালসহ প্রাকৃতিক জলাশয়ের পরিবেশ রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে এ সংকট আরও বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে উল্লাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন বাঙ্গালা, উধুনিয়া, বড় পাঙ্গাসীতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদন হয়। তবে গত কয়েক বছরে প্রত্যাশার তুলনায় এবার উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, শুঁটকি উৎপাদন অনেকাংশে আবহাওয়া ও মাছের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। আগে যেসব বিলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানি থাকত, এখন বৃষ্টি ও বন্যার স্বাভাবিক পরিস্থিতি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে পানির স্থায়িত্ব কমে গেছে। পাশাপাশি অবৈধ জালের ব্যবহারও মাছের উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।
তিনি আরও জানান, দেশি প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ, মাছের পোনা রক্ষা এবং প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা উদ্যোগ হচ্ছে।