যমুনার কথা ডেস্ক:
পোলট্রি খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন কাঁচামালের দাম সম্প্রতি ৯ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে এর বিপরীতে উৎপাদিত খাদ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। ফলে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না অনেক ফিড উৎপাদক। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে সংকুচিত হচ্ছে এ খাতের মুনাফা। এতে দেশের পোলট্রি ফিড শিল্প গভীর চাপের মুখে পড়েছে। তবে ফিডের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
তাঁদের অভিযোগ, মুনাফা বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই খাদ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে খামারিদের ওপর। এর ফলে মুরগি ও ডিমের দামও বাড়ছে বলে দাবি তাদের। অন্যদিকে ফিড উৎপাদকদের বক্তব্য, কাঁচামালের দাম যে হারে বেড়েছে, সেই তুলনায় উৎপাদিত খাদ্যের দাম বাড়ানো হয়নি। ফলে বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ খাতে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র হওয়ায় কোনো প্রতিষ্ঠান এককভাবে দাম বাড়াতে দ্বিধায় থাকে। কারণ, দাম বাড়ালে বাজারের অংশীদারি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত মুনাফায় ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে ফিড উৎপাদকদের।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি ভুট্টার দাম ৩১ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা ৮০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দাম বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ।একই সময়ে সয়াবিন মিলের দাম প্রতি কেজি ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬ টাকা হয়েছে, যা প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। পোলট্রি খাদ্য তৈরির প্রধান উপাদান ভুট্টা ও সয়াবিন মিল। কিন্তু এ সময়ে প্রতি কেজি পোলট্রি ফিডের দাম ৬৮ টাকা থেকে বেড়ে ৭২ টাকা ৫০ পয়সা হয়েছে। অর্থাৎ খাদ্যের দাম বেড়েছে মাত্র ৭ শতাংশের মতো। অন্যান্য কাঁচামালের দামও বেড়েছে। প্রতি কেজি ডি-অয়েলড রাইস ব্রানের দাম ২৬ টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ টাকা, রাইস ব্রানের দাম ৩৩ টাকা থেকে বেড়ে ৩৯ টাকা এবং সরিষার খৈলের দাম ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৯ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে।
কাঁচামালের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে পোলট্রি খাদ্যের উৎপাদন ব্যয়ে। আর খাদ্যের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মুরগি ও ডিম উৎপাদনের খরচও বেড়ে যায়। এর ফলে ভোক্তা পর্যায়ে মুরগি ও ডিমের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে পোলট্রি শিল্পের অংশীজনরা সরকারের কাছে কাঁচামালের আমদানি কর কমানোর দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি ও আন্তা ফিড মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, গত আগস্টে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন সয়াবিন মিলের দাম ১০০ ডলার বা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে ৫৩০ ডলারে পৌঁছেছিল।
তিনি বলেন, ‘আগস্টের শেষ দিকে প্রতি কেজি ফিডের দাম ২ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে আরো ২ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। এর পরও ফিড মিল মালিকরা লোকসান করছেন।’
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিও এ সংকটের অন্যতম কারণ। ব্রাজিলে ভুট্টার দাম বাড়ার পর বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে বেড়েছে জাহাজভাড়া।
প্যারাগন অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, ‘বিশ্বের অন্য কোথাও কাঁচামালের দাম বাড়লে কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের বাজারে পড়ে।’
কোয়ালিটি ফিডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহতেশাম বি শাহজাহান বলেন, ‘পোলট্রি খাদ্য উৎপাদনে প্রায় ৮০ ধরনের উপাদান প্রয়োজন হয়। এসব উপাদানের দাম সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।’
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে পোলট্রি শিল্পে আয়কর ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিট লাভ অনেক কমে গেছে।
আকিজ ফিড মিলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা এ টি এম হাবিবুর রহমান বলেন, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন ভুট্টার দাম ২৩৫ ডলার থেকে বেড়ে ২৯০ ডলারে উঠেছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘সব উপকরণের দাম বাড়লে আমরা কিভাবে আগের দামে পোলট্রি ফিড বিক্রি করব?’
ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও পদ্মা ফিড মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ারুল হক বলেন, দেশের পোলট্রি ফিড শিল্পের কাঁচামালের প্রায় ৬৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে এ খাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, ‘কাঁচামালের দাম যে হারে বেড়েছে, তার তুলনায় ফিডের দাম সামান্যই বাড়ানো হয়েছে। এখন আমাদের টিকে থাকার লড়াই করতে হচ্ছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কাঠামো পর্যালোচনা করে ব্রয়লার গ্রোয়ার ফিডের উৎপাদন ব্যয় প্রতি কেজি ৬১ টাকা ৭৭ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য ৬৯ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ হিসাব কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। তাই পুরো শিল্পের বর্তমান মুনাফার চিত্র বুঝতে আরও বিস্তৃত তথ্য প্রয়োজন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে প্রাণিখাদ্যের চাহিদা বেড়ে এক কোটি টনে পৌঁছতে পারে। ওই সময় মোট প্রাণিখাদ্যের ৬৫ শতাংশ চাহিদা আসবে পোলট্রি খাত থেকে।