শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
পুলিশের টহল পিকআপের পাশে যুবলীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৪ রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন সিরাজগঞ্জে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মুড়ি তৈরি করায় জরিমানা ধুনটে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ উঠে এলো একাত্তরের যুদ্ধদিনের কথা জামালপুরের পিংনায় অবৈধ বালুঘাটের ছড়াছড়ি, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার সিরাজগঞ্জে গ্রামীণ নারী দিবসে সমাবেশ ও মেলা অনুষ্ঠিত উল্লাপাড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের দখল করা ঘরগুলো নিয়ন্ত্রনে নিল প্রশাসন চাঁদা না পেয়ে মারধর করায় ইউপি সদস্যের সংবাদ সম্মেলন টাঙ্গাইলে ট্রেন লাইনচ্যুত, ৬ ঘণ্টা পর রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক নারিতায় বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি যাত্রা বিলম্বিত

টাঙ্গাইলে ১৫৬ বছর পরও সচল সূর্য ঘড়ি

  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৬.৩৭ পিএম

উজ্জল, টাঙ্গাইল সংবাদদাতা:

টাঙ্গাইলের সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ১৫৬ বছর আগে স্থাপিত সূর্য ঘড়ি এখনো বর্তমান ঘড়ির সঙ্গে মিল রেখে সময় জানিয়ে দিচ্ছে। সূর্যের আলোর ছায়া ও নির্দিষ্ট পরিমাপের ভিত্তিতে সময় নির্ধারণ করে ব্রিটিশ আমলের সূর্যঘড়ি আজও নির্ভুলভাবে জানিয়ে দিচ্ছে সময়।

জানা যায়, ১৫৬ বছর আগে জানালাবিহীন ১০টি কক্ষে ১০১টি দরজা রেখে ঐতিহ্যবাহী সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৭০ সালে জমিদার শ্রীমতি জাহ্নবী চৌধুরানী বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আজও ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। বিদ্যালয়ের অনন্য নিদর্শন সূর্য ঘড়ি। আশ্চর্যের বিষয় হলো দেড়শ শতাব্দী পেরিয়েও গেলেও এই সূর্য ঘড়ি বর্তমান ঘড়ির সঙ্গে মিল রেখে সময় জানিয়ে দিচ্ছে। এছাড়াও বিদ্যালয়ের রয়েছে ঐতিহ্যবাহী আয়নাদিঘী। জমিদার আমলে এই দিঘীর পানি আয়নার মতো উজ্জ্বল ছিল বিধায় এর নামকরণ করা হয়েছিল আয়নাদিঘি। জমিদার জাহ্নবী চৌধুরীরানী এলাকার মানুষের লেখাপড়ার কথা চিন্তা করে এ বিদ্যালয়টি বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। জাহ্নবী চৌধুরানীর জমিদারী ছিল ছয়আনী এলাকাজুড়ে। নয় বছর বয়সে তার বিবাহ হয়। বিয়ের পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি স্বামী হারান। স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত করার পর তিনি কলকাতা থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে বিদ্যালয়ের জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনে এনেছিলেন। সে সময়ের দরিদ্র ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য মাসিক বৃত্তি ২২০ টাকা এবং ৩২জন শিক্ষক-কর্মচারীর জন্য সম্মানী বা ভাতা ১৫০ টাকা করে নিজ তহবিল থেকে দিতেন তিনি। তখন টাঙ্গাইল জেলা ছিল বৃহত্তম ময়মনসিংহ বিভাগের আওতায়। সেই সময় ময়মনসিংহ বিভাগের দ্বিতীয় তম ইংলিশ ভার্সন চালু ছিল এই বিদ্যালয়টিতে। এই বিদ্যালয়ের প্রতি কক্ষে ১৫টি করে মোট ১০১টি দরজা রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে বিদ্যুৎ কিংবা সোলার প্যানেল না থাকায় মূলত বাহির থেকে আলো আসার জন্য এই দরজাগুলো স্থাপন করা হয়। ব্রিটিশ স্থাপত্যে তৈরি এই ভবনের দেওয়াল পুরু ২২ ইঞ্চি ও উচ্চতা ২ হাজার ২০০ ফুট। সেখানে রয়েছে মোঘল আমলের সিন্দুকসহ নানা ধরনের ঐতিহাসিক ছবি। এছাড়াও বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে রয়েছে পদার্থ রসায়ন ও জীব বিজ্ঞানের ব্যবহারিক টুলস। তৎকালীন সময় বিদ্যালয়ে সময় নির্ধারণ করার জন্য সূর্যঘড়ি স্থাপন করেন জমিদার জাহ্নবী চৌধুরানী। একটি স্তম্ভের উপর সূর্যর আলোর ছায়ার পড়ার ভিত্তিতে দৈর্ঘ্য নির্ণয় করে এটির সময় নির্ধারণ করা হয়। স্তম্ভের পাশে ৪টি ঘর রয়েছে, প্রতিটি ঘরের মাপ ১৫। সূর্যের আলোর ছায়ার দৈর্ঘ্যের পরিমাণ ও ক্যালেন্ডারের সাহায্যে মূল রিডিং পরিমাপ করে ঘন্টা নির্ধারণ করা হয়। বর্তমান যুগের ডিজিটাল ঘড়ি আর ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ঘড়ি সময় নির্ধারণ একই যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। ১৫৬ বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী এই বিদ্যালয় আজ অবহেলা ও অযত্নে হারিয়ে যেতে বসেছে। ভবনে ফাটল ধরেছে, একটু বৃষ্টি হলেই শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে, ঝুঁকি নিয়েই চলছে পাঠদান। ইতিহাসের এই অনন্য স্থাপনা এখন জরাজীর্ণ। ঐতিহ্য রক্ষায় দ্রুত এই বিদ্যালয়টি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

স্থানীয় আনিছুর রহমান খান বলেন, রোদের আলো এবং ছায়ার অবস্থান দেখে প্রায় দেড়শত বছর ধরে সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয়ের সূর্য ঘড়ি নিখুঁতভাবে সময় নির্ধারণ করে দিচ্ছে। যা দেখেই ক্লাস ক্লাস পরিচালনা করছেন শিক্ষকরা।

বিদ্যালয়ে ৯ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাঈদা তাসনিম বলেন, ঐতিহ্যবাহী স্কুলে রয়েছে ১০১টি দরজা ও অন্যতম একটি সূর্য ঘড়ি। সূর্যের আলো যখন এই ঘড়ির উপর পড়ে, সেই ছায়া দেখেই বুঝতে পারি এখন কয়টা বাজে। নতুন শিক্ষার্থীরা ভর্তি হওয়ার পর বিদ্যালয়টির একজন অভিজ্ঞ সিনিয়র শিক্ষক সূর্য ঘড়ির সময় কিভাবে বুঝতে হবে সে বিষয়ে ধারণা দিয়ে থাকেন।

১৩ বছর যাবত বিদ্যালয়টিতে পিয়ন হিসেবে কর্মরত রয়েছেন আরিফ খান। তিনি বলেন, চাকুরির শুরুতে সূর্য ঘড়ি দেখে ঘন্টা বা বেল দিতে পারতাম না। বিদ্যালয়ে শিক্ষক অরুণ স্যার প্রথম দিকে আমাকে সূর্যঘড়ির সেকেন্ড, মিনিট ও ঘন্টার কাঁটা বুঝিয়ে দিতেন। অনেক সময় সূর্য ঘড়ির সাথে নিজের হাত ঘড়ির সময় মিলিয়ে দেখতাম ঠিক আছে কি না।

তিনি আরো জানান, নিজের হাতের ঘড়ি এখন আর প্রয়োজন হয় না। তবে সূর্য ঘড়ির সময় দেখতে কিছুটা সময় লাগে। সূর্য ঘড়ির সময় নির্ধারণ করতে একটি স্তম্ভের ছায়ায় সেকেন্ড, মিনিট ও ঘন্টার কাটা কোন অবস্থানে আছে সেটি হিসাব করে বের করতে হয়। সহজ কথা সূর্য আকাশের যে দিকে থাকবে। ছায়া ঠিক তার বিপরীত দিকে থাকবে। সেখান থেকেই হিসাব করতে হয়।

এ বিষয়ে সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক দুলাল রায় বলেন, বিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ হলো সূর্যঘড়ি (ঝঁহ উরধষ)। সময় নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক পি.সি সেন এই সূর্যঘড়িটি স্থাপন করেন। সূর্যঘড়িটি সূর্যের আলোর কারণে সৃষ্ট ছায়ার দৈর্ঘ্য ও অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে সময় নির্ণয় করে। এটি ব্যবহার করে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা যায়।

তিনি আরো বলেন, ঘড়িটিতে একটি খাড়া স্তম্ভ রয়েছে, যার ছায়া বিপরীত পাশে পড়লে রোমান সংখ্যায় চিহ্নিত ঘরগুলো দেখে সময়ের হিসাব করা হয়। এ ছাড়া স্তম্ভের পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ ক্যালেন্ডার, যেখানে ১২ মাসের নাম ও তারিখ উল্লেখ করা রয়েছে। ক্যালেন্ডারে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী মূল পাঠের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময় যোগ বা বিয়োগ করে প্রকৃত সময় নির্ণয় করা হয়। এভাবেই সূর্যের ছায়াকে কাজে লাগিয়ে সময় নির্ধারণের এক প্রাচীন ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়।

শিক্ষক দুলাল রায় বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও এই সূর্যঘড়ি আমাদের অতীতের জ্ঞান, বিজ্ঞানচর্চা ও ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি শুধু সময় নির্ণয়ের একটি মাধ্যম নয়, বরং সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাস ও গৌরবময় ঐতিহ্যের এক মূল্যবান নিদর্শন।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের এই ঐতিহাসিক সূর্যঘড়ি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে অনেক দর্শনার্থী আসেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব। সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিজ্ঞান ও শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত এক গৌরবময় প্রতিষ্ঠান।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. চান মিয়া বলেন, শ্রীমতি জাহ্নবী চৌধুরীরানী ১৮৭০ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত করেন। বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভবনে ১০১ টি দরজা ও সূর্য ঘুড়ি। সূর্য ঘড়ির মাধ্যমে আমরা সময় নির্ণয় করি। ব্রিটিশ আমলের ইংরেজি শিক্ষক পিসি সেন এই ঘড়িটি আবিষ্কার করেন।

প্রধান শিক্ষক বলেন, বর্তমানে বিদ্যালয়ের ভবনটি লাজুক অবস্থায় রয়েছে। ভবনের দেয়ালগুলোতে ফাটল ধরেছে। আতঙ্ক নিয়ে ক্লাস করতে হয়। এটি সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহায়তা কামনা করেন তিনি।

এ বিষয়ে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নাতী (দৌহিত্র) মাহমুদুল হক শানু বলেন, দেড়শ বছর পেরিয়েও বিদ্যালয়টি নিখুঁত কারিগরী ও স্থাপত্যশৈলীর অন্যান্য নিদর্শন হিসেবে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঐতিহাসিক এই নিদর্শন সংরক্ষণে দ্রুত সংস্কারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

পোস্টটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের আরও খবর
কপিরাইট © ২০২৬ | যমুনার কথা