যমুনার কথা ডেস্ক:
পুলিশের যানবাহন সংকট কাটাতে ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, জরুরি পরিস্থিতিতে জনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে ছয় হাজার ৬০৯ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে যানবাহন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় চার হাজার ৮২৯টি অপারেশনাল যানবাহন এবং এক হাজার একটি বিশেষায়িত যানবাহন। দুটি পৃথক প্রকল্পের আওতায় এসব গাড়ি কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পুরো ব্যয়ই মেটানো হবে সরকারি কোষাগার থেকে। প্রস্তাবিত প্রকল্প দুটি আগামী রবিবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান সভায় সভাপতিত্ব করবেন।
পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ এবং ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’—এ দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পুলিশ। প্রকল্প দুটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত।
পুলিশের যানবাহন কেনার এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বহর-সংকট, পুরনো গাড়ির আধিক্য এবং মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনায় সীমাবদ্ধতার কথা। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প প্রস্তাবের তথ্যানুযায়ী, জেলা ও মহানগর পুলিশের অধীন ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানায় বর্তমানে যানবাহন রয়েছে মাত্র এক হাজার ২৩৭টি। এর ৬৪ শতাংশের বয়স ১০ বছরের বেশি। থানাপ্রতি গড় যানবাহনের সংখ্যা দুইটিরও কম। অন্যদিকে অপরাধ দমন, টহল, অভিযান, নির্বাচন ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় একসঙ্গে একাধিক এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এর সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত ও হারিয়ে যাওয়া যানবাহনের শূন্যস্থান পূরণের বিষয়টিও সামনে এনেছেন পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য, ওই সময় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে নতুন যানবাহন না কেনায় তৈরি হওয়া ঘাটতিও পূরণ করতে হবে। গাড়ির অভাবে অভিযান ও নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে দুই প্রকল্পের নথিতে অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির নির্দিষ্ট সংখ্যা আলাদাভাবে উল্লেখ নেই।
৬৩৯ থানায় গাড়ি ১ হাজার ২৩৭টি : অপারেশনাল যানবাহন কেনার প্রকল্পের প্রস্তাবে পুলিশের বিদ্যমান বহরের সংকটের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জেলা ও মহানগর পুলিশের অধীন ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানায় বর্তমানে যানবাহন রয়েছে মাত্র এক হাজার ২৩৭টি। এসব গাড়ি দিয়ে প্রায় এক লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় টহলসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। বিদ্যমান যানবাহনের ৬৪ শতাংশের বয়স ১০ বছরের বেশি।
প্রকল্পের তথ্যানুযায়ী, থানাপ্রতি গড়ে দুটি যানবাহনও নেই। একটি থানা থেকে কোনো দল অভিযানে বের হলে অন্য এলাকায় টহল বা জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ পরিস্থিতিতে সাধারণভাবে প্রতিটি থানায় অন্তত চার থেকে পাঁচটি পিকআপ বা টহলযান থাকলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একসঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। জনবহুল, ব্যস্ত ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী আরো বেশি যানবাহনের প্রয়োজন হতে পারে।
শুধু নিয়মিত টহল নয়, অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, অপরাধী গ্রেপ্তার, আলামত সুরক্ষা, মাদকবিরোধী অভিযান ও সন্ত্রাস দমনের মতো কাজেও পর্যাপ্ত যানবাহনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন বা বড় কোনো আয়োজনে দেশের বিভিন্ন থানায় একযোগে অতিরিক্ত যানবাহনের চাহিদা তৈরি হয়। বর্তমান ঘাটতি পূরণ না হলে জনসেবা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতে পারে বলে প্রকল্পের যৌক্তিকতায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অপারেশনাল গাড়িতেই ব্যয় ৪ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা : অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্পে চার হাজার ৮২৯টি গাড়ি কেনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে চার হাজার ১৮৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের মোট ব্যয় চার হাজার ৩২৮ কোটি ৯২ লাখ টাকার মধ্যে যানবাহন কেনার খাতেই প্রায় ৯৬.৬৫ শতাংশ ব্যয় হবে। বাকি অর্থের মধ্যে নিবন্ধন ফি, চালক ও মেকানিকদের প্রশিক্ষণ, মেরামতের যন্ত্রপাতি, সরঞ্জামসহ অন্যান্য খাত রয়েছে।
প্রকল্পে ৬৫০ জন হালকা যানচালক এবং ৩০০ জন ভারী যানচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীকে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫০ জন যানবাহন মেকানিককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। গাড়ি মেরামতের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন গাড়ি কেনার পাশাপাশি চালনা ও মেরামতের সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থাও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ থেকে অপরাধস্থল তদন্ত : দ্বিতীয় প্রকল্পে এক হাজার একটি বিশেষায়িত যানবাহন কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ২৮০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে যানবাহন কেনার খাতেই বরাদ্দ দুই হাজার ২২৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের বিবরণে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যান, দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় চলাচলের উপযোগী অল-টেরেন ভেহিকল (এটিভি), মোবাইল কমান্ড সেন্টার এবং অপরাধস্থল তদন্তের ভ্যানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যান জনশৃঙ্খলা রক্ষার বিশেষ পরিস্থিতিতে ভূমিকা রাখবে। এটিভি দুর্গম এলাকায় পুলিশের পৌঁছানোর সক্ষমতা বাড়াবে। মোবাইল কমান্ড সেন্টার মাঠ পর্যায়ে অভিযান পরিচালনার সময় ভ্রাম্যমাণ নিয়ন্ত্রণকক্ষ হিসেবে কাজ করতে পারবে। আর অপরাধস্থল তদন্তের ভ্যানের মাধ্যমে ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ সহজ হওয়ার কথা। তবে এক হাজার একটি বিশেষায়িত যানবাহনের ধরন অনুযায়ী পৃথক সংখ্যা প্রকল্প-সারসংক্ষেপে উল্লেখ নেই।
বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পে ৯১০ জন চালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীকে প্রশিক্ষণ এবং ৫০ জন মেকানিককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এ খাতে যথাক্রমে এক কোটি ১৪ লাখ ৮৯ হাজার এবং ৩৯ লাখ ৮৩ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। দুটি প্রকল্পেই প্রশিক্ষণ ও যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণকে কার্যকর বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।
ক্রয়বিধি ও রক্ষণাবেক্ষণে নজরদারি : প্রকল্প দুটির ওপর গত ১৫ অক্টোবর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সুপারিশে যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি, অর্থ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিধি-বিধান অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান যানবাহনের কতগুলো সচল, মেরামতযোগ্য কিংবা ব্যবহার অনুপযোগী—তার বিস্তারিত তথ্য প্রকল্প নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
নতুন গাড়ি কেনার পর সেগুলো সচল রাখার জন্য রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং যানবাহনের অনুমোদিত সংখ্যা বা টিওঅ্যান্ডই সংশোধনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পে মোবাইল নজরদারির যানবাহন ও বিদেশে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব বাদ দেওয়ার সুপারিশের কথাও নথিতে রয়েছে। প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দেশীয় নীতিমালা অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যানবাহন পুলিশের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলেও শুধু গাড়ির সংখ্যা বাড়ালেই সেবার মান নিশ্চিত হয় না। দক্ষ চালক ও কারিগরি জনবল, নিয়মিত মেরামত, জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের সরবরাহ এবং গাড়ির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয়।