যমুনার কথা ডেস্ক:
১৯৯৩ সাল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদীকেন্দ্রের হ্যাচারির পাশে খাট পেতে রাত কাটাতেন তরুণ এক বিজ্ঞানী। পানির পাত্রে সদ্য জন্ম নেওয়া পাঙ্গাশের পোনা। একটু অসতর্ক হলেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে সব। তাই রাতের পর রাত সেখানেই থাকতেন তিনি। সেই তরুণ আর কেউ নন, বিজ্ঞানী মোহাম্মদ খলিলুর রহমান। ওই বছরই দেশে প্রথমবারের মতো থাই পাঙাশের কৃত্রিম প্রজননে সফল হন তিনি। তার গবেষণার ধারাবাহিকতায় পরে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে থাই পাঙ্গাশের চাষ।
এক সময় সচ্ছল পরিবারের মাছ হিসেবে পরিচিত পাঙাশ উঠে আসে নিম্ন আয়ের মানুষের খাবারের পাতে। খলিলুর রহমান বলছিলেন, স্বাধীনতার পর দেশে মানুষের আমিষের প্রধান উৎস ছিল উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছ। ১৯৭১ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তখন মাছের উৎপাদন ছিল প্রায় পাঁচ লাখ টন। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মাছের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ১৮ লাখ টনে। পাঁচ দশকের বেশি সময়ে নদী-নালা, খাল-বিল ও পুকুর কমেছে। কিন্তু পানিদূষণ বেড়েছে। তবু মাছের উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। যার পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে মৎস্যবিজ্ঞানীদের গবেষণার।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিশারিজ টেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর শেষে ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) চাঁদপুর নদীকেন্দ্রে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন খলিলুর রহমান। পরের বছরই দায়িত্ব পান দেশি পাঙ্গাশ নিয়ে গবেষণার। তখন পাঙ্গাশ ছিল নদীর মাছ। পুকুরে বাঁচবে কি না, কৃত্রিমভাবে ডিম পাড়ানো যাবে কি না, কিছুই নিশ্চিত ছিল না। নদী থেকে জীবিত পাঙাশ ধরে এনে পুকুরে প্রতিপালন শুরু করেন খলিলুর রহমান। মাছ সংগ্রহের জন্য চাঁদপুর থেকে যেতেন বরিশালের হিজলা পর্যন্ত।
খলিলুর রহমান বলছিলেন, ‘সারাদিন ও সারারাত নদীতে কাটিয়েছি। নিজেই স্পিডবোট বা জাহাজ চালিয়ে নদী থেকে পাঙাশ সংগ্রহ করতাম।’ গবেষণায় তিনি দেখলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া পাঙাশ চাষের উপযোগী। স্থানীয় খাবার দিয়েই সম্ভব মাছটি পালন। পাঙাশ সর্বভুক। তাই বাণিজ্যিক চাষেও এর সম্ভাবনা বেশি। আর এ কাজে স্ত্রী ছিলেন তার প্রধান অনুপ্রেরণা। তাদের দুই ছেলে। বড় ছেলে নাদিম রহমান চিকিৎসক। ছোট ছেলে নাভিদ রহমান প্রকৌশলী।
নতুন বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে খলিলুর রহমান বলেছেন, গবেষণার মূল লক্ষ্য হতে হবে মানুষের কল্যাণ। শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে গবেষণা করলেই হবে না, মাঠে ও পুকুরপাড়ে গিয়ে চাষিদের সমস্যা বুঝতে হবে। চাঁদপুরের সেই হ্যাচারিতে হয়তো তিনি আর রাত কাটান না। কিন্তু দেশে পাঙাশ চাষে যে পরিবর্তন এসেছে, এর পেছনে রয়েছে তার বড় অবদান। কোনো পরিবারের খাবারের পাতে পাঙাশের ঝোল উঠলে, সেখানে খলিলুর রহমানের দীর্ঘ গবেষণার ফলও পৌঁছে যায়। এই দৃশ্য দেখলে আজও তার মুখে ফুটে ওঠে হাসি।