শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৫ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
পুলিশের টহল পিকআপের পাশে যুবলীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৪ রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন সিরাজগঞ্জে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মুড়ি তৈরি করায় জরিমানা ধুনটে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ উঠে এলো একাত্তরের যুদ্ধদিনের কথা জামালপুরের পিংনায় অবৈধ বালুঘাটের ছড়াছড়ি, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার সিরাজগঞ্জে গ্রামীণ নারী দিবসে সমাবেশ ও মেলা অনুষ্ঠিত উল্লাপাড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের দখল করা ঘরগুলো নিয়ন্ত্রনে নিল প্রশাসন চাঁদা না পেয়ে মারধর করায় ইউপি সদস্যের সংবাদ সম্মেলন টাঙ্গাইলে ট্রেন লাইনচ্যুত, ৬ ঘণ্টা পর রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক নারিতায় বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি যাত্রা বিলম্বিত

মনিটরিং স্টেশনের জনবলে ওয়ান স্টপ সার্ভিস

  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১.৫৫ পিএম

যমুনার কথা ডেস্ক 

একটি বিভাগীয় চিঠিতেই বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ছয়টি মনিটরিং স্টেশনের কাজ। ২০০৭ সালে শুধু তরঙ্গ পর্যবেক্ষণের জন্য স্থাপিত এসব স্টেশনে এখন বসবে গ্রাহকসেবা, নথি গ্রহণ ও উদ্যোক্তা-সহায়তার মতো নতুন কার্যক্রম। কিন্তু শাখা কার্যালয় স্থাপনে সরকারের পূর্বানুমতির বিধান থাকলেও এ উদ্যোগের অনুমোদন এসেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অভ্যন্তরীণ পত্রের মাধ্যমে। কার্যপরিধি সম্প্রসারণ ও জনবলের দায়িত্ব বদলের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন ও অর্থ বিভাগের মতামত নেওয়া হয়েছে কি না, তারও কোনো প্রমাণ নেই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বিটিআরসির ছয়টি মনিটরিং স্টেশনের কার্যপরিধি বদলের এই অনুমোদন আদৌ কতটা বিধিসম্মত?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিটিআরসির উদ্যোগটি এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন কমিশনের অভ্যন্তরে কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। বদলিকৃত কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে পদায়নে নীতিগত আপত্তি নেই। তবে কোনো কার্যালয় বা স্টেশনে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন, অবকাঠামো ও সাংগঠনিক কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।

গত ৮ জুলাই বিটিআরসির স্পেকট্রাম মনিটরিং বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিনুল হক স্বাক্ষরিত এক স্মারকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের কাছে অনুমোদন চাওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বগুড়া ও রংপুরে থাকা ছয়টি ফিক্সড মনিটরিং স্টেশনকে দিয়ে ওয়ান স্টপ সার্ভিস, সাধারণ ডকুমেন্ট গ্রহণ, মাঠ পর্যায়ে কোয়ালিটি অব সার্ভিস-সংক্রান্ত তথ্য উদঘাটন এবং ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তার মতো কাজ করা হবে। অথচ এই ছয়টি ফিক্সড মনিটরিং স্টেশন ২০০৭ সালে অনুমোদিত ‘স্ট্রেংদেনিং দি রেগুলেটরি ক্যাপাসিটি অব বিটিআরসি’ প্রকল্পের আওতায় শুধু তরঙ্গ পর্যবেক্ষণের জন্য স্থাপন করা হয়েছিল। অর্থাৎ, যে অবকাঠামোর মূল উদ্দেশ্য ছিল তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ, এখন সেটির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গ্রাহকসেবা, নথি গ্রহণ, মাঠ পর্যায়ে সেবার মান যাচাই ও উদ্যোক্তা-সহায়তার মতো নতুন কার্যক্রম।

চিঠি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নতুন কার্যক্রম চালাতে নতুন জনবল বা অতিরিক্ত বাজেট না রাখার কথা জানিয়েছে বিটিআরসি। চিঠিতে বলা হয়েছে, কমিশনের জনবল কাঠামো সংশোধনের কাজ ‘সময়সাপেক্ষ’। তাই বিদ্যমান জনবল দিয়েই এসব কার্যক্রম চালানো হবে। প্রতি স্টেশনে সাপোর্ট টিমসহ মাত্র ২-৩ জন কর্মী দিয়ে বাড়তি দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে। জনবল কাঠামো সংশোধনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান। অর্থাৎ, যে কাঠামোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পদের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি নির্ধারণ হওয়ার কথা, সেটি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই নতুন কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিটিআরসির ওই প্রস্তাবের পর ১৯ আগস্ট ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ স্বাক্ষরিত পত্রে এতে সম্মতি দেওয়া হয়। শর্ত দেওয়া হয়, নতুন জনবল ও অতিরিক্ত ব্যয় করা যাবে না। একই সঙ্গে ওয়ান স্টপ সার্ভিস, ডকুমেন্ট গ্রহণ ও উদ্যোক্তা-সহায়তার মতো সেবাগুলো যেন গ্রাহক ঘরে বসেই অনলাইনে পেতে পারেন, সে ব্যবস্থাও নিতে বলা হয়। এখানেই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। যে সেবার একটি অংশ অনলাইনে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে, সেই সেবা দিতে ঢাকার বাইরে ভগ্নপ্রায় স্থাপনায় কর্মকর্তা মোতায়েনের প্রয়োজন কেন তার ব্যাখ্যা নেই। তবে এর চেয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে অনুমোদনের ধরন নিয়ে।

টেলিযোগাযোগ আইনের ধারা ৮ অনুযায়ী, শাখা কার্যালয় স্থাপনে সরকারের পূর্বানুমতির প্রয়োজন। আবার কোনো সংস্থার কার্যপরিধি সম্প্রসারণ, নতুন কার্যালয়ের কার্যক্রম নির্ধারণ বা জনবলের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের মতো বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ এবং অর্থ বিভাগের সম্মতির প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু ছয়টি মনিটরিং স্টেশনের কার্যপরিধি সম্প্রসারণের পুরো প্রক্রিয়াটি হয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের একজন সিনিয়র সহকারী সচিবের স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে। জনপ্রশাসন বা অর্থ বিভাগের কোনো মতামত নেওয়ার প্রমাণ চিঠিতে নেই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের পূর্বানুমতির শর্ত কীভাবে পূরণ হলো এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না।

ছয় মনিটরিং স্টেশন ২০০৭ সালে নির্দিষ্ট একটি প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছে, একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত অবকাঠামোর কার্যপরিধি শুধু বিভাগীয় পত্রের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায় কি না। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প সংশোধন (ডিপিপি রিভিশন) বা নতুন করে সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।

বিটিআরসির কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ছয়টি মনিটরিং স্টেশন ২০০৭ সালে তরঙ্গ পর্যবেক্ষণের জন্য গড়া হলেও দেড় দশকে এগুলো কতটা কার্যকরভাবে সেই দায়িত্ব পালন করেছে, তার কোনো স্বচ্ছ মূল্যায়ন নেই। দেড় দশকে স্টেশনগুলোর যন্ত্রপাতি কেন অকার্যকর পড়ে আছে, এ প্রশ্নের উত্তর কোথায়? মূল দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ একটি প্রতিষ্ঠান এখন গ্রাহকসেবা, নথি গ্রহণ ও উদ্যোক্তা-সহায়তার মতো নতুন কাজ হাতে নিচ্ছে, যা দায়বদ্ধতা এড়ানোর কৌশল ছাড়া কিছু নয়। মূল কাজই যেখানে প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে নতুন দায়িত্ব চাপানো যুক্তিসংগত নয়। ভগ্নপ্রায় স্থাপনায় মাত্র ২-৩ জন কর্মী দিয়ে এই সেবা দেওয়া অবাস্তব, বিশেষত সেবাগুলো যখন অনলাইনেই দেওয়ার কথা। কার্যকর যন্ত্রপাতি সারিয়ে মূল কাজ করার বদলে কার্যপরিধি বাড়ানো এই কার্যক্রমকে দায়বদ্ধতা এড়ানোর কৌশল বলেও মন্তব্য করেন কয়েকজন।

নতুন দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি এসব স্টেশনের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির অবস্থাও প্রশ্ন তৈরি করছে। সরেজমিনে জানা যায়, স্টেশনগুলোর অধিকাংশই বিটিসিএলের পুরোনো পরিত্যক্তপ্রায় ভবনের কোনো কক্ষ ভাড়া নিয়ে স্থাপন করা হয়েছে। এসব অফিসের যন্ত্রপাতিও পুরোনো হয়েছে। কোনো কোনো স্টেশনে দুই-তিন বছর ধরে স্টেশনগুলোতে স্থাপিত তরঙ্গ মনিটরিং সক্ষমতা যাচাই-সংক্রান্ত সব যন্ত্রপাতি অকার্যকর হয়ে আছে। বছর দুয়েক আগে বগুড়া স্টেশনে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে এক কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। পরে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। বর্তমানে এসব স্টেশনে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা মূলত ঢাকা কার্যালয়ের ডিজিটাল নথি নিষ্পত্তি করেন। নতুন কার্যক্রম নেই বললেই চলে। যেখানে স্টেশনগুলোর মূল দায়িত্ব পালনের যন্ত্রপাতিই অকার্যকর, সেখানে একই জনবল দিয়ে গ্রাহকসেবা, নথি গ্রহণ, মাঠ পর্যায়ে সেবার মান যাচাই ও উদ্যোক্তা-সহায়তার মতো বাড়তি দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগের বাস্তবতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।

কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসব কাজের জন্য প্রযুক্তিগত ও অপ্রযুক্তিগত জনবলের সমন্বয়ে কমিটি এবং উন্নত মানের যানবাহন ব্যবহার করা হয়। সেখানে দুই-তিনজন কর্মীর একটি স্টেশনে একই ধরনের কাজ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে তরঙ্গ মনিটরিংয়ের পাশাপাশি গ্রাহকসেবা, ডকুমেন্ট গ্রহণ, মাঠ পর্যায়ে সেবার মান যাচাই ও উদ্যোক্তা-সহায়তার মতো কাজ একই জনবল দিয়ে পরিচালনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কতটা কার্যকর হবে, সেটিও স্পষ্ট নয়।

বক্তব্য জানতে বিটিআরসি চেয়ারম্যানের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে গত ৪ অক্টোবর বিটিআরসির মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড পাবলিকেশন উইংয়ের উপ-পরিচালক মো. আব্দুস শাহীদ চৌধুরীর কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগের দিন পর্যন্ত তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনার প্রশ্ন আমরা নথিতে তুলেছি, উত্তর পেতে সময় লাগবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন
এই বিভাগের আরও খবর
কপিরাইট © ২০২৬ | যমুনার কথা