ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, রোগের পূর্বাভাস এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও স্যালাইনের সরবরাহ নিশ্চিত করার ফলে মৃত্যুহার কমেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর তথ্য বিশ্লেষণ করে আগেভাগে পরিকল্পনা নেওয়া, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করার সুফল পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে নলেজ হাব ইনস্টিটিউট আয়োজিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সহনশীলতা’ শীর্ষক পলিসি ডায়ালগে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যগত প্রভাব’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন নলেজ হাবের প্রেসিডেন্ট খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পুরুষের তুলনায় নারীদের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। এর পেছনে চিকিৎসাগত কারণের পাশাপাশি সামাজিক কারণও রয়েছে। নারীদের অসুস্থতাকে অনেক সময় কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে তাদের চিকিৎসা নিতে দেরি হয় এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক রোগী অসুস্থ হওয়ার তিন দিনের বেশি সময় পর হাসপাতালে এসেছেন। দেরিতে হাসপাতালে আসার কারণে রোগীর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। এর পেছনে চিকিৎসাগত কারণের পাশাপাশি মানুষের চিকিৎসা নেওয়ার আচরণও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, পুরুষ অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রবণতা থাকলেও নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় অসুস্থতাকে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে নারীরা দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছান। তখন রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোগের পূর্বাভাস ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে জুলাই-আগস্ট থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও স্যালাইনের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও আগেভাগে শুরু করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, আগাম সতর্কতার সুবিধা শুধু আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, নীতিনির্ধারকদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। আগে থেকে পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, সরবরাহ ও অন্যান্য প্রস্তুতি যথাসময়ে নেওয়া যায়। ডেঙ্গুর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট তাপপ্রবাহ ও আর্দ্রতার স্বাস্থ্যগত প্রভাব মোকাবিলায়ও কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আবহাওয়া অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান তথ্য আরও কার্যকরভাবে বিশ্লেষণ করে নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। ডেঙ্গু ও তাপপ্রবাহের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এসব জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব চিহ্নিত করে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
প্রতিমন্ত্রী গবেষক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ তৈরি এবং পরবর্তী দুই থেকে তিন মাস নীতিনির্ধারকদের কাছে তা তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশে ডেঙ্গুতে ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭০৫ জন, ২০২৪ সালে ৫৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। উপস্থাপনায় বলা হয়, হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গুরোগীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ঢাকার বাইরের হলেও মৃত্যুর ৫৭ থেকে ৬৪ শতাংশ ঘটে ঢাকা শহরের হাসপাতালগুলোতে।