যমুনার কথা প্রতিবেদক
সিরাজগঞ্জের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক সংকট ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। জেলার নয়টি উপজেলায় ১ হাজার ৬৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১ হাজার ৫৬টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক। অর্থাৎ জেলার ৬৩ শতাংশের বেশি বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। এসব বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদের বিপরীতেও ১৯৪টি পদ শূন্য রয়েছে। এতে একদিকে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পাঠদানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় ২৪৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৪০টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া রায়গঞ্জে ১১৩টি, কাজীপুরে ১৫৯টি, বেলকুচিতে ১০৩টি, তাড়াশে ৯৭টি, কামারখন্দে ৩১টি, শাহজাদপুরে ১৫৫টি, চৌহালীতে ৯০টি এবং উল্লাপাড়ায় ২৭৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬৮টিতে প্রধান শিক্ষক নেই।
জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৯ হাজার ৩৭৩টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ৯ হাজার ১৭৯ জন। ফলে এ পদেও ১৯৪ জন শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের এমন সংকটে বিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অধিদপ্তরের অনুমোদন পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে এসব পদে নিয়োগ বা পদায়নের মাধ্যমে সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হবে।
শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু পাঠদান তদারকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন সভায় অংশগ্রহণ, সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহসহ নানা দায়িত্ব পালন করতে হয়। প্রধান শিক্ষক না থাকায় এসব কাজের বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের। এতে নিয়মিত পাঠদানের সময় কমে যাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রায়গঞ্জ উপজেলার কয়ড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আশরাফুল আলম বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক না থাকায় জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে ২০১৯ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। শিক্ষা দপ্তরের বিভিন্ন কাজে উপজেলা ও জেলা অফিসে যাতায়াত করতে হয়। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমও তদারক করতে হয়। ফলে আগের মতো নিয়মিত ক্লাস নিতে পারি না। এতে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।’
সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মহীদুল হাসান বলেন, ‘একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানকে পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। প্রাথমিক শিক্ষায় এমনিতেই শিক্ষক স্বল্পতা, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত চাপ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সীমিত যোগাযোগ এবং অবকাঠামোগত ঘাটতিসহ নানা সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষক সংকট পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষক সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দুর্বল শিক্ষার্থীরা। তাদের বাড়তি পরিচর্যা প্রয়োজন হলেও শিক্ষক স্বল্পতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। আবার অনেক শিক্ষক প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করতে আগ্রহী নন। সব মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় সংকট তৈরি হয়েছে। তাই দ্রুত প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ করা জরুরি।’
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাহাব উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় কিছু সমস্যা হচ্ছে। এসব শূন্য পদ পূরণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি দেয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত শূন্য পদ পূরণের ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের এ সংকট নিরসন না হলে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।